সুইডেনের পথে, ICSE এর সাথে - পর্ব ২

Written on June 27, 2018

স্টকহোম থেকে গোটেবর্গ (লোকাল উচ্চারণ) আসার জন্য উঠেছিলাম SAS এর প্লেনে। এদের প্লেনে আবার ক্লাসিফিকেশন আছে লোকাল ফ্লাইটেও। যেমন SAS plus একাউন্ট থাকলে লাইনে আপনাকে আগে ঢুকতে দিবে, প্লেনের ভিতরে লেখা থাকবে এই সিটগুলো প্লাসের। আবার খাবারও ওদের বেশি বেশি দিবে। তো উঠার আগে লোকাল টার্মিনালের লাউঞ্জে বসে ছিলাম। ওখানেই দেখলাম 100% গ্রিন পাওয়ার। এরা যে কি পরিবেশ সচেতন বলা যাবে না। যাকগে, আমি প্লাস ছিলাম না বলে আমার প্লেনে কফি খেয়েই সারতে হয়েছে। সাধারণত ডোমেস্টিক ফ্লাইটে ছোট প্লেন ব্যবহার করে, আর ছোট প্লেন বেশি কাঁপে বলে আমার বরাবরই বেশ ভয় লাগে। এই প্লেনটা টেক অফ করার সময় চালকের মুন্সিয়ানার বেশ খুশি হলাম, বাহ - ভালো চালায় তো। কাপাকপি নাই। আগে শুনেছিলাম SAS এর পাইলটরা ক্রেজি, কথাটা অমূলক। ভাবতে না ভাবতেই প্লেন দিলো ডানদিকে টান। এমন টান যে মনে হলো পড়েই যাবো আরেকটু হলে। করে কি করে কি, ভাবতে ভাবতে নীচে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। এমনিতেই সুইডেনে গাছপালায় ভর্তি। একটু উপরে উঠলেই গাছ আর গাছ। সেখানে দেখি বেশ সুন্দর এক একটা বিশাল লেক পার হয়ে যাচ্ছি। আবারও গোটেবর্গ এর কাছে গিয়ে টান মারা অংশটা বাদ দিলে আর তেমন কোন কিছু হয়নি।

গোটেবর্গ নেমে লাগেজ টাগেজ সংগ্রহ করে ইন্টারনেটে ঢুকতে গিয়ে বেকুব হয়ে গেলাম। একই ইণ্টারনেট প্রোভাইডার, তাই সেই যে তিন ঘন্টা স্টকহোমে ব্যবহার করেছি, ঐকারণে এখানে আর ইন্টারনেট পাবো না। যাই হোক, গোটেবর্গ থেকে আমি যেখানে থাকবো তার কাছে যেতে হলে কর্শভাগেন আসা লাগে। এটা অনেকটা গুলিস্তানের মতো। অনেক দিকের ট্রাম বা বাস ওখান থেকে যাওয়া আসা করে। ওখানে যেতে হলে হয় এয়ারপোর্টের বাস কোচ নিতে হবে, নাহলে ট্যাক্সি। বাস কোচে লাগে ১০৫ ক্রোনা, সবচেয়ে সাশ্রয়ী অপশন আরকি। (১ ক্রোনা মানে ১০ টিয়া, গেছি রে আমি 🤕) এইটার টিকেট আবার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কিনতে হয় মেশিন থেকে। মানুষের বালাই নেই। এখানে পড়লাম বিপদে। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কিনতে গেলে kod চায়। kod মানে কি আবার? ইতিউতি তাকিয়ে গুতাগুতি করে বুঝলাম এইটা PIN কোড চাইছে। পোড়া কপাল, কোড তো মনে নাই। দেশে তো কার্ড দিলেই হয়ে যায়, কোড মোডের বালাই নেই। এদিকে বাস একটা আসে, হুশ করে চলে যায়। ইন্টারনেটও নাই। ইন্টারনেট না থাকলে কেমনে কি, কোড জানতে পারবো না। বাসায় আমি কাউকে বলতেও পারবো না কোডের কাগজ দেখে জানাতে। আমি তো শ্যাষ। করবো কি? খাবো কি? (আমার কাছে খেতে না পারা মানে মহা বিপদ)। এদিক তাকাই, ওদিক তাকাই, মানুষও দেখি না যে টিকেট বিক্রি করবে।

একটু পরে দেখি এক চাইনিজ খুটুর খাটুর করে টিকেট কিনছে ওই মেশিন থেকে। দৌড়াই গিয়ে বললাম ভাইডি, তুমি কি ICSE এর জন্য আসছো? সম্মতি জানাতেই বললাম এই অবস্থা, কাজেই সে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কিনে দিক,আমি তারে ক্যাশ দিয়ে দিতেছি। সে বললো কোন সমস্যা নাই, আমি কিনে দিচ্ছি। এইটা কমন প্রবলেম আমাগো চাইনিজদের জন্য। আমাগো পিন কোড ৬ ঘরের, দুনিয়ার সবখানে পিন চায় ৪ঘরের। কাজেই আমাদের এমন অবস্থার ভিতর দিয়ে প্রায়ই যাইতে হয়। চলো এখন।

আমিও মনে মনে তারে থেঙ্কু জানাতে জানাতে বাসে উঠে পড়লাম। বাস এর রাস্তা বেশ সুন্দর। জানলাম সে লুকসেম্বর্গ ইউনি থেকে আসছে, এই রকম কাজ করে, এই সেই। বাস এর ভিতরে আবার নেট আছে। কাজেই বউরে বললাম জানাও তাত্তারি, কোড কি। বেচারিও খুঁজে পেতে দৌড়ঝাঁপ করে পেলো পিন কোডটা।

কর্শভাগেন পৌঁছে গেলাম প্রেসবায়রেন দোকানে। এটা ছোট ছোট স্টেশনারি দোকান, খাবার সহ নানা জিনিষ পাওয়া যায়। সেখান থেকে ৩দিনের টিকেট কিনতে লাগে ১৯০ ক্রোনা, যত খুশি লোকাল বাসে বা ট্রামে যাওয়া আসা করা যায় এই তিনদিন এক টিকেট দিয়ে। এই টিকেট কিনতে আবার ক্রেডিট কার্ডের “কড” চায়নি। দেশি নিয়মে কার্ড পাঞ্চ করে সাইন করে দিলেই হয়। আগে থেকে বাসায় কোন ট্রামে যাবো, কত নাম্বার, সেটা কোন কোন স্টপে থামবে সেটা লিখে নিয়েছিলাম। (সুমাইয়া ভাবীরে বিশেষ ধন্যবাদ এজন্য)। কিন্তু এখানে এসে গেল আউলায়ে। ৬নাম্বার ট্রাম তো বামে ডানে যাচ্ছে, কিন্ত যে স্টপেজ গুলোর কথা লিখে আনছি গুগল ম্যাপ থেকে সেগুলোর নাম তো নাই কোথাও। পথচারীদের জিজ্ঞাসা করি, ভাই ভেগাগাতান কোনদিকে যাবো? জানি না। অলিভদলসগতন? তাও জানি না। শেষমেশ একজন বললো আচ্ছা এই রুট চালমার্স ইউনি দিয়ে যায়, তাহলে তুমি ডানদিকের যাওয়া ৬ নাম্বার ট্রাম নিবা। ধন্যবাদ জানিয়ে দিলাম ঐদিকে দৌঁড়। ট্রাম থেকে নেমে বেশ খানিকটা হাটতে হয়,৫মিনিটের মতো। পুরোটাই খাড়া রাস্তা, ছবির মতো সুন্দর। আমার সাধাসিধে মোবাইলের ক্যামেরাতেও সুন্দর ছবি তুলে ফেললাম কয়েকটা। তারপরে করলাম হোস্টেলে চেকইন। এবার বিছানা দখল আর খাদ্যভিজানের পালা, বিকাল ৪টা বেজে গেছে! ১৬জন এক এক রুমে, ক্যামনে কি!

(চলবে)